তিল কে তাল করা মতি ভাইয়ের অভ্যাস। কোন কিছু ঘটার আগে তা ফলাও করে প্রচারনা না করলে তার ঘুম আসে না। কোরবানী এসে গেছে।, সবাই ইনবক্সে মতি ভাইকে জিজ্ঞেস করছেন, ভাই গরু না ছাগল? মতি ভাই গরু না ছাগল এটা বুঝি প্রশ্নকর্তা বুঝে না! মতি ভাই বিরক্ত হয়ে উত্তর দেন না। দু একজনকে ব্লক করেছেন ইতিমধ্যে। এখন নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। পথে ঘাটে দেখা হলে এখন মতি ভাইকে লোকজন জিজ্ঞেস করে, ভাই গরু না ছাগল? মতি ভাই রাগ করে উত্তর দেন "বাঘ বাঘ"।
ভাবা মাত্রি ফেসবুকে পোস্ট কোথায় সবচেয়ে বড় গরু পাওয়া যায় তা জানতে চেয়ে পোস্ট দিয়ে দেলেন। পোস্ট দেখা মাত্রই কয়েকজন বিভিন্ন গরুর হাটের নাম লিখে কমেন্ট করতে লাগলো। দু একজন টিটকারি করলো অবশ্য। তবে জরিফে গাবতলি বড় গরু পাওয়া যায়, এমন মতামত বেশি পাওয়া গেলো। মতি ভাইও জানেন গাবতলীতে বড় গরু পাওয়া যায়। গরু কিনার আগে গরু যে কিনতে যাচ্ছেন, তা প্রচারণার জন্যই না ফেসবুক পোস্ট দেয়া।
আজ গরু কিনতে যাবেন মতি ভাই। অতি শুভ দিন! মতি ভাই সুন্দর একটা জামা পড়ে নিলেন। এরা শুধু গরু কিনতে যাওয়ার সময় ও ফিরে আসার সময়ও স্লোগান দেবে। বাসা থেকে বের হতেই স্লোগান দিতে লাগল....
'সবচেয়ে বড় গরু? মতি ভাইয়ের গরু! '
আরো কত রকম শ্লোগান। মতি ভাই মহল্লা দিয়ে যাওয়ার সময় হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছে যেন ভোটে দাঁড়িয়েছেন। মতি ভাই তার হাটমুখি সব আবডেট ফেসবুকে দিয়ে যাচ্ছেন। হাত নাড়ানোর একটা পিক ইতিমধ্যে দিয়েছেন।
পুরো হাট ঘুরে একটা গরু কিনলেন মতি ভাই। পাচ লাখ টাকা দিয়ে কিনেছেন।
"পাচ লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনলাম সবাই দোয়া করবেন"
এমন কয়েকটা স্টেটাস দিলেন মতি ভাই।এত দামী গরু অথচ তার সংগে সেল্ফি হবে না তা কি করে হয়! মতি ভাই গরুর সংগে একটা কাউফি তুলতে গেলেন। গরুও বড় বেরসিক বটে, সম্ভবত প্রাইভেসিতে এমন হস্তক্ষেপ গরুটা পছন্দ হয়নি। যেই তিনি সেল্ফি তুলতে যাবেন, গরুটা মতি ভাইয়ের গায়ে বসিয়ে দিলো এক লাথি! মতি ভাই দশ হাত দূরে ছিটকে পড়লেন। পড়লেন তো পড়লেই নি তাও আবার গরুর গোবরের স্তুপের উপর!
মতি ভাই চেচাতে লাগলেন। আশেপাশে মানুষ হাসলে লাগল। মতি ভাইয়ের সারা শরীর এবং জানাতে গোবর লেগে আছে। কিন্তু তিনি হেরে যাওয়ার মানুষ না। গরু নাকি সেল্ফি তুলতে চায় না? এটা কোন কথা! গরুর সংগে সেল্ফি তুলে ফেসবুকে দিতেই হবে! সেল্ফি তোলার আগে তিনি গোবরের স্তুপ থেকে উঠে গরুর একটা সিংগেল ছবি তুলেই ফেসবুকে দিয়ে দিলেন, ক্যাপশন দিলেন, আমার গরু.... গরুটা কেমন লাগছে? নিচে একজন কমেন্ট করল, 'ভাই আপনাকে তো সুন্দর লাগছে কিন্তু গরু কই ভাই?' মতি ভাই তার কমেন্ট দেখে রেগেমেগে ব্লক দিয়ে দিলেন।
গরুর গলায় সিং এর মালা পড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সংগে সংগে ছেলেগুলো শ্লোগান দিয়ে যাচ্ছে। মতি চাওয়ের মুখে অন্যরকম এক সাফল্যের হাসি লেগে আছে। এই মহল্লায় তার চেয়ে বেশি দাম দিয়ে গরু কেনেনি। ভাবতেই ভালো লাগছে। ভালো লাগাটা যদিও বেশিক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হয় না মতি ভাইয়ের চোখে মুখে। দামি গরু কিনলে ঠেলাগুলোও বড়সড় খেতে হয়, দামী গরুর ঢং তো বেশি থাকবেই, নাকি! কিছু দূর যাওয়ার পর গরু দিলো ভো দোড়! শুরু হলো গরুর পিছনে ম্যারাথন ।
সামনে দৌড়াচ্ছে গরু। তার পিছনে পোলাপান। সবার পিছনে মতি ভাই। পোলাপান দৌড়াচ্ছে তাও আবার স্লোগান দিতে দিতে। মতি ভাইয়ের বিরক্ত আরো বেড়ে গেলো!
দৌড়াতে দৌড়াতে মতি ভাই বেশ হাপিয়ে উঠেছেন মতি ভাই। মহল্লার অলিগলি দৌড়ানোর পর শেষমেশ পোলাপানগুলো গরুকে ধরতে পারল। গরু নিয়ে রি যাত্রায় কোনমতে বাসায় আসলেন মতি ভাই।
বাসার সামনে প্রদর্শনীর জন্য গরুকে রাখা হয়েছে। মহল্লার সবচেয়ে বড় এবং দামী গরু এটি। বিভিন্ন বয়সী ছেলেমেয়েরা এসে গরুর সংগে সেল্ফি তুলছে। মতি ভাই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন,
-সেল্ফি তোলো ভালো কথা। কিন্তু ফেসবুক পোস্টে কিছু নিয়ম অনুসারণ করতে হবে....
-কী নিয়ম?
- গরুর ভালো ছবি দিতে হবে। এরপর অবশ্যই লিখে দিতে হবে এটা মতি ভাইয়ের গরু এবং সবচেয়ে দামী গরু।
-ঠিক আছে।
আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তে লাগল। মতি ভাই বুনো হাসি দিয়ে মনে মনে ভাবেন "এইবার দেখাইয়া দিলাম"
ঈদের দিন চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল মতি ভাইয়ের। মতি ভাইয়ের গরু খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। একি শুনছে মতি ভাই! তার দুনিয়া পুরো এলোমেলো হয়ে গেল! একটু পর কোরবানি দিতে হবে, অথচ গরু খুজে পাওয়া যাচ্ছে না! চারদিকে হইচই রব পরে গেল! মতি ভাই পুলিশে খবর দিলেন। অনেক খোজার পরও গরু পাওয়া গেলো না। পুলিশ তদন্ত করে জানল, গত রাতেই সম্ভবত গরুটি চুরি হয়ে গেছে। মতি ভাই গরু না পেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। তার মাথায় পানি দিচ্ছেন তার স্ত্রী। লোকজন আস্তে আস্তে জেনে গেছে মতি ভাইয়ের গরু চুরি হয়ে গেছে। কদিন আগে যারা গরুর সংগে সেল্ফি তুলছে তারাই অজ্ঞান মতি ভাইয়ের সাথে সেল্ফি তুলে ফেসবুকে শিরোনাম দিচ্ছে " লাখ টাকার গরু হারিয়ে মতি ভাই আজ অজ্ঞান"

No comments:
Post a Comment