Saturday, 26 August 2017

একজন সুখী মানুষের গল্প



আবুল বাশার সাহেব মহাবিরক্ত হয়ে আছে। এমনিতেই রাজপথে হাটুপানি, তার ওপর আজ অফিসে সাধের ছাতাটা রেখে বেরিয়ে পড়েছেন। যা ওয়েদার, খানিক আগে এক ফসলা বৃষ্টি হয়ে চারপাশে তাকিয়ে স্পষ্ট বলে যেওয়া যায়, আকাশে ঘন কালো মেঘ স্থির হয়ে আছে, হয়তো আচমকা বৃষ্টি হয়ে পড়ার মোক্ষম সুযোগ খুজছে। সারাদেশে নিন্ম অঞ্চলগুলোতে ভয়াবহ বন্যার চিত্র কল্পনা করে আবুল বাশার সাহেব নিজেকে সান্ত্বনার অভয় শুনান। হাটুপানি বেয়ে বীরদর্পে বাসা পানে হাটতে থাকেন। বাগড়া দেয় বৃষ্টি, প্রথমে ঝিরঝির এরপর মুষলধারা বৃষ্টির ফোটা পড়ে জামা-কাপড়, অফিস ব্যাগ ভিজিয়ে দেয়।

'জঘন্য ওয়েদার' ফাজিল বৃষ্টি'!  বিড়বিড় করে বলেন বাশার সাহেব। কিছু সময়ে তিনি রবীন্দ্রনার্থ কিংবা হুমায়ূন আহমেদের বৃষ্টি বিষয়ক রোমান্টিক কবিতা-গান বেমালুম ভুলে যায়।

মগবাজারের পচতলার বাড়ীটার ৫ তলার একটি ফ্লাটে আবুল বাশার সাহেবের বসবাস।  বাসার সামনের রাস্তাটায় হাটুপানি জমে আছে বহুদিন। কারন এতদিন ধরেই পানি জমে আছে যে বাশার সাহেবের সাধ্য নেই গণনা করে সঠিক সংখ্যাটা বের করবেন। এই নগরী দুইজন মেয়রের অস্তিত্ব সংকট ভুগছে অথচ মেয়রদ্বয়ের মতো হাজারখানেক দর্শক পেলেও এ শিল্প ঘুরে দাড়াতে পারে। আফসোস।

এসব হাজারটা সমস্যার মধ্যে কিছু পোলাপান আবার বন্যার্তদের জন্য ত্রান চাইতে আসে। বাশার সাহেব ঠিক করলেন,  কাউকে কিছু দেবেন না! বন্যার্ত আবার কি, শহর বন্দর সবখানেই তো বন্যা!
হঠাত সেদিন সন্ধ্যায়, পাঁচতলা ভবন প্রবলভাবে দুলে উঠলো। সাধারণ ভূমিকম্পে যতটুকু দোলে তার ছেয়েও ভয়াবহ এর দুলুনি। আবুল বাশার সাহেব একদিকে কাত হয়ে কোনরকম নিজেকে ব্যালেন্স রাখলেন। দুলুনি কমে এসেছে, তবে গলা শুখিয়ে গেছে প্রচণ্ড! একগ্লাস পানি খেতে পারলে মন্দ হতো না.... তার স্ত্রী ছেলেসহ বাপের বাড়ি গেছে, পানি দেওয়ার কেউ নেই। আবুল বাশার আরো কিছু ভাবতে যাচ্ছিলেন, তবে তিনি স্পষ্ট অনুভব করলেন পুরো ভবন দ্রুতবেগে চলতে শুরু করেছে। মহাসড়কে এসি বাসের মত তুমুল সেই বেগ। আবুল সাহেব চেহারায় প্রচণ্ড বিরক্তি ফুটিয়ে তুলে বললেন, 'এসব হচ্ছেটা কী? ফাজলামো নাকি?

তবে হুট করে তার মনে হলো ব্যাপারটা খারাপ না। বিল্ডিংটা হয়তো নিজে নিজেই হেটে বা দৌড়ে অন্য কোথাও চলে যাচ্ছে। তিনি ভাবলেন, ' নাহ, এইবার প্রভু আমার দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন..
জলাবদ্ধ এলাকা থেকে উদ্ধার করে শুলশান, বনানী, মতো অভিজাত এলাকায় ট্রান্সফার করেছেন'। কিন্তু তা কি করে আর সম্ভব!

যাই হোক, আবুল বাশার সাহেব নিজেকে আবিষ্কার করলেন সমুদ্রে। চারদিকে অথৈ পানি। পুরোবাসাসহ তাকে অদৃশ্য কোন শক্তি সমুদ্রে এনে রেখে গেছে। এইবার তিনি ভাবলেন চিতকার করবেন পরক্ষণেই কিছু ভেবে নিরব হয়ে গেলেন। অদ্ভুত ভাবে লক্ষ করলেন তিনি বেশ স্বাচ্ছন্দে পানির নিচে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছেন, সাতার কাটতে পারছেন, মাছের ভাষাও বুঝতে পারছেন। বিরাট শক্তির কথা! যাক বাবা! বউয়ের প্যারা, বৃষ্টির প্যারা এমনকি লাগাতার চলতে থাকা জলাবদ্ধতার প্যারা থেকে তিনি এখন মুক্ত। স্বাচ্ছন্দ্য সাগর চষে বেড়ানো যাবে। সাগরের তাজা তিমির সংগে বড়সড় রকমের ভাব করবেন বলেও ঠিক করে ফেলেন তিনি।

সাগরের দিন-রাত ভালোই কাটছে আবুল বাশার সাহেবের। কেউ কিচ্ছু বলার নেই, কোন অশান্তি কিংবা চিন্তা নেই। কিন্তু হঠাত একদিন......
বাশার সাহেব খেয়াল করলেন, তার পুরোশরীরে জল পেছিয়ে যাচ্ছে! এসব কি! আর কেনই বা অনিচ্ছায় তিনি উপরের দিকে উঠে যাচ্ছেন? পাশ দিয়ে দুটো পাবদা মাছ যাচ্ছিলো, মাছেদের ভাষা বোঝেন বাশার সাহেব, একটা আরেকটাকে টিটকারি মেরে শুনাচ্ছে,
এহ, আইছে মানুষের বাচ্চা সাগরে বাসা বাধতে, এখন জেলের জালে ধরা পইড়া জীবন খোয়াইবো'। তাহলে কি বাশার সাহেব ক্রমেই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন? সাগরে নতুন মাছ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে জেলেদের স্বীকারে পরিণত হতে যাচ্ছেন?

না আ আ আ আওয়াজ ধপ করে বিছানার শোয়া থেকে বসে পড়লেন বাশার সাহেব। ইদানীং তিনি ভয়াবহ সব দু:স্বপ্ন দেখছেন। যাক বাবা, তিনি সমুদ্রে টমুদ্রে না, ছোটখাটো জলাবদ্ধতার ওপরে বেশ আয়েশি বিছানায় শুয়ে আছেন। কিছু সময়ের জন্য তিনি নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ মনে হল। নগরে ফুটপাতে থাকা লোকগুলো কিংবা বানভাসি নিম্নাঞ্চল লোকগুলো ঘুমানোর জন্য সাধারণ বিছানাও তো পাচ্ছে না। সুখের সংঙ্গা সীমিত করে মৃদু হেসে আর একগ্লাস ফ্রিজের ঠান্ডা পানি খেয়ে আবার ঘুমাতে যান আবুল বাশার সাহেব। এরপর থেকে নিজেকে বড় সুখি ভাবতে পারছেন।

No comments:

Post a Comment

গরু হারিয়ে মতি ভাই আজ অজ্ঞান

তিল কে তাল করা মতি ভাইয়ের অভ্যাস। কোন কিছু ঘটার আগে তা ফলাও করে প্রচারনা না করলে তার ঘুম আসে না। কোরবানী এসে গেছে।, সবাই ইনবক্সে মতি ভা...