কাওরান বাজারের ফুটফাত শরাফত হিমুর মত খালি পায়ে হেটে যাচ্ছে। খানিক দূরে পিচ ঢালা মুল রাস্তায় গেউ গেউ করতে থাকা কুকুরটাও তার দিকে তাকাচ্ছে না। হিমু হতে চায় এমন অনেকেই দেখেছে সে। কিন্তু হিমু হতে চাওয়ার কোন ব্যাপার তার মধ্যে নেই, নিতান্ত অসহায় হয়েই তাকে খালি পায়ে হেটে যেতে হচ্ছে।
একটু ফ্ল্যাশব্যাক গেলে অবশ্যই তার খালি পায়ের রহস্যটা জানা যায়..
শরাফাত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়েছে তখন। জেলা শহরে তার সুদৃশ্য ছিলো। কলেজে উঠার পর তার বাবার কাছ থেকে জোর করে বাইক আদায় করে নেয়। জগন্নাথে ভর্তি হয়ে একটা ডিএসএলআর হয়ে গেলো। শরাফতের বাবা খুব সচেতন লোক, এ বয়সে ছেলেদের চাহিদা তিনি বুঝেন। তবে ছেলেকে একটাই শর্ত দিলেন, পড়ালেখা করতে হবে ঠিকঠাক। শরাফত মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির হলেও তার বারা হাত খরচ টা একটু বেশিই পাঠান। মিশুক টাইপেট ছেলে বলে যে মেসে উঠেছে সে মেসের প্রায় সবার একান্ত প্রিয় দের তালিকায় চলে যায় শরাফত। তাছাড়া বাইক, ডিএসএকআর একটা প্রভাব তো থাকেই। ভার্সিটি লাইফে প্রথম প্রেম হয়ে যেতেও সময় লেগেছে মাত্র ২০ দিন। একই ডিপার্টমেন্ট এর সুমাইয়ার সাথে প্রেম হয় তার। তার প্রতি সুমাইয়ার দুর্বলতা আচ করতে পেরে শরাফত প্রথম প্রফোজ করে, এর পর থেকে আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতেই হয় নি। আজ কাওরান বাজারের ফুটফাতেও সে সামনে তাকিতেই হাটছে।
প্রোফজের দিনটার কথা মনে করার চেষ্টা করে শরাফত। মেসের বড় ভাই মজিবরের কাছ থেকে নগদ বিশ হাজার টাকা ধার নিয়ে প্রোফজ করার জন্য বসুন্ধরা থেকে স্পেশাল আংটি কিনেছিলো সে। সুমাইয়ার সেদিনের চকচকে চেহারাটা আজো চোখে ভাসছে শরাফাতের। প্রেমের পর শরাফত ভেবেছিলো জীবনটা মন্দ না। আজ ফুটফাতে হাটার সময়ও সে ভাবছে, জীবনটা আসলেই মন্দ না, অন্তত সুমাইয়ার জীবনটা তো অবশ্যই।
সুমাইয়ার প্রেমে এতটাই বিভর ছিলো শরাফত, যখনই যে কোন আবদার নিয়ে আসতো, শরাফত তার আবদার মেটানোর যথাসম্ভবের চাইতেও এক ডিগ্রী বেশি চেষ্টা করতো। ভালোবাসার দিবসে সুমাইয়াকে গিফট দিতে হয়েছিলো প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার এটা সেটা শপিং, খাবার দাবারের সহজ আলাপ না হয় বাদ থাক। সাদের ডিএসএলআর টা তাকে হারাতে হয়েছিলো সেদিনই, কারন ডিএসএলআর জমা নিয়েই এই টাকাটা দার দিয়েছিলো মেসের বড় ভাই। সে টাকা আর শোধ করা গেলো কই!
ভালোবাসার দিবসের পর বৈশাখের কথা স্পষ্ট মনে পড়েছে শরাফাতের। বৈশাখে অবশ্যই বিশ হাজার খরচেই শপিং আটকানো গিয়েছিলো, অল ক্রেডিট গোজ টুটাইম, সেদিন মার্কেট বন্ধ করে দেওয়ার টাইম ঘনিয়ে এসেছিলো বলে এটা সম্ভব হয়েছিলো।
ঈদ উপলক্ষে গার্লফ্রেন্ড গিফট দিতে হবে এটা তার ভালোই জানা ছিলো। শেষ সম্বল ভরসা রাখার একমাত্র জাগয়া বাইকটা বিক্রি করে রমজানের দুইদিন আগে গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে মার্কেটে ছুটলো শরাফাত। শরাফত ভাবে, প্রেম টিকলে এমন হাজারটা বাইক বিসর্জন তা কাছে কিছুই না। বাইকের টাকাও সুমাইয়ার মন মত শপিং হলো না, নাকফুলটা কিনার তখনও বাকী ছিলো। ঈদের আগেই এটাও হয়ে যাবে বলে শরাফত প্রেমিকাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলো সেদিন। আহা, শরাফত সুমাইয়ার করা ওদিনের মুখটাও মনে করার চেষ্টা করে। শরাফত রমজানটা রিলাক্স হয়ে কাটাবে ভেবেছিলো, গার্লফ্রেন্ড কেই প্রর্যাপ্ত ঈদ উপহার কিনে দেওয়া শেষ। তবে বিপত্তি ঘটলো পরশু দিন। ফুটফাতে হাটতে হাটতে নিজ মনেই হেসে উঠলো শরাফত। ব্রেকাআপ টা তার কাংখিত ছিলো না মোটেই। সে কল্পনায়ও ভাবেনি সুমাইয়াকে ব্রেকা আপ করো বললে সে নির্দ্ধিধায় সে হ্যা বলে দেবে!
শরাফত পরশু দিনের ঘটনা মনে করতে চাইছে না। সেহেরি খেয়ে কি সুন্দর চ্যাটে 'হ্যাপি ডে' 'সোনা বাবু' বলে ঘুমাতে গেল, ঘুম ভাঙল সেই সুমাইয়ার ফোন কলেই। বাজারে নতুন এসেছে কাটাপ্পা ড্রেস এবং শিবগামি নেকলেস, যা তার লাগবেই। তার বান্ধবিদের সবাই নাকি এই আজগবি গিফট পেয়েছে, এখন তাকেও পেতে হবে। রমজানের আগেই লক্ষাধিক টাকার গিফট দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে কোন কাজ হলো না। মেসের বড় ভাইয়ের কাছে নিজের খাট, পড়ার ডেস্ক আর বই পত্র বন্ধক রেখে বিশ হাজার টাকা নিয়ে তখনি ছুটতে হলো প্রেমিকাকে কাটাপ্পা ড্রেস আর শিবগামী নেকলেস কিনে দিতে।
এতটুকু পর্যন্ত ঠিক ছিলো। তবে পরদিন অর্থাৎ গতকাল আবারও গার্লফ্রেন্ডের ফোনে তার ঘুম ভাঙল এবং নতুন "বিলকিছ জুতা" গিফট এর বায়না পূরণ ছুটতে হলো। যথারীতি এবার বন্ধক মোবাইল ফোন। জুতা কিনে দেওয়ার পর গার্লফ্রেন্ডের হাসি তার মনে স্বস্তি বয়ে আনলো। রিকশায় করে প্রেমিকাকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে যাচ্ছিল শরাফত, হঠাত কি ভেবে সুমাইয়া বলে উঠলো 'এই শুনো, ভুলেই গিয়েছিলাম, আমার জরুরি নেইল পালিশ লাগবে। চলো না আবার মার্কেটে যাই।
টাকার কোন উতস মানে বন্ধক রাখার জন্য কোনো কিছু খুঁজে পেলো না শরাফাত। গার্লফ্রেন্ডকে একটা হাত পাখা কিনে দেওয়ার টাকাও অবশিষ্ট নেই তার হাতে। কীভাবে সুমাইয়াকে দমানো যায় খানিকটা ভাবলো সে। 'সুমাইয়া আমার রাগ টের পেলে দমে যাবে', মনে মনে ভাবে শরাফত।
'দেখো, সুমাইয়া! আমি তোমাকে আর কিছুই কিনে দিতে পারবো না, চাইলে তুমি ব্রেক আপ করে নাও'
একটি কর্কশ শোনায় শরাফতের কন্ঠ।
সুমাইয়া কথাটাকে টেনে নিয়ে আসে, হ্যা ব্রেক আপ, সামান্য একটা নেইল পালিশ চাইলে যে বয়ফ্রেন্ড ব্রেক আপ করে নাও বলতে পারে তার সংগে রিলেশনশিপ আমার কোন আগ্রহ নেই। আমি কি গাড়িবাড়ি এসব কিছু চেয়েছিলাম? আজ থেকে তোমার রাস্তা এই দিকে আমার রাস্তা অন্যদিকে, যাও রাস্তা মাপো' স্বাভাবিক গলায় কথাগুলো বলে যায় সুমাইয়া। রিক্সা থামিয়ে নামিয়েও দেয় তাকে।
এবার ফুটপাতের পাশে বসে পড়ে শরাফত, আর ভাবতে পারছে না। প্যাকেট থেকে একটা গোল্ডলিফ সিগারেট বের করে সে, সিগারেট টা ধরিয়ে ফিল্টারে ফুক দেয়। আজ নামমাত্র মূল্যে মুচির কাছে জুতা জোড়া না বেচলে সিগারেটের প্যাকেটটা কেনা হতো না তার।
অথচ সে কখনোও অন্য অনেকের মত হিমু হতে চায়নি!!!""""

No comments:
Post a Comment