Wednesday, 30 August 2017

গরু হারিয়ে মতি ভাই আজ অজ্ঞান


তিল কে তাল করা মতি ভাইয়ের অভ্যাস। কোন কিছু ঘটার আগে তা ফলাও করে প্রচারনা না করলে তার ঘুম আসে না। কোরবানী এসে গেছে।, সবাই ইনবক্সে মতি ভাইকে জিজ্ঞেস করছেন, ভাই গরু না ছাগল? মতি ভাই গরু না ছাগল এটা বুঝি প্রশ্নকর্তা বুঝে না! মতি ভাই বিরক্ত হয়ে উত্তর দেন না। দু একজনকে ব্লক করেছেন ইতিমধ্যে। এখন নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। পথে ঘাটে দেখা হলে এখন মতি ভাইকে লোকজন জিজ্ঞেস করে, ভাই গরু না ছাগল? মতি ভাই রাগ করে উত্তর দেন "বাঘ বাঘ"।
ভাবা মাত্রি ফেসবুকে পোস্ট কোথায় সবচেয়ে বড়  গরু পাওয়া যায় তা জানতে চেয়ে পোস্ট দিয়ে দেলেন। পোস্ট দেখা মাত্রই কয়েকজন বিভিন্ন গরুর হাটের নাম লিখে কমেন্ট করতে লাগলো। দু একজন টিটকারি করলো অবশ্য। তবে জরিফে গাবতলি বড় গরু পাওয়া যায়, এমন মতামত বেশি পাওয়া গেলো। মতি ভাইও জানেন গাবতলীতে বড় গরু পাওয়া যায়।  গরু কিনার আগে গরু যে কিনতে যাচ্ছেন, তা প্রচারণার জন্যই না ফেসবুক পোস্ট দেয়া।

আজ গরু কিনতে যাবেন মতি ভাই। অতি শুভ দিন! মতি ভাই সুন্দর একটা জামা পড়ে নিলেন। এরা শুধু গরু কিনতে যাওয়ার সময় ও ফিরে আসার সময়ও স্লোগান দেবে। বাসা থেকে বের হতেই স্লোগান দিতে লাগল....
'সবচেয়ে বড় গরু? মতি ভাইয়ের গরু! '
আরো কত রকম শ্লোগান। মতি ভাই মহল্লা দিয়ে যাওয়ার সময় হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে যাচ্ছেন। মনে হচ্ছে যেন ভোটে দাঁড়িয়েছেন। মতি ভাই তার হাটমুখি সব আবডেট ফেসবুকে দিয়ে যাচ্ছেন। হাত নাড়ানোর একটা পিক ইতিমধ্যে দিয়েছেন।

পুরো হাট ঘুরে একটা গরু কিনলেন মতি ভাই। পাচ লাখ টাকা দিয়ে কিনেছেন।
"পাচ লাখ টাকা দিয়ে গরু কিনলাম সবাই দোয়া করবেন"
এমন কয়েকটা স্টেটাস দিলেন মতি ভাই।এত দামী গরু অথচ তার সংগে সেল্ফি হবে না তা কি করে হয়! মতি ভাই গরুর সংগে একটা কাউফি তুলতে গেলেন। গরুও বড় বেরসিক বটে, সম্ভবত প্রাইভেসিতে এমন হস্তক্ষেপ গরুটা পছন্দ হয়নি। যেই তিনি সেল্ফি তুলতে যাবেন, গরুটা মতি ভাইয়ের গায়ে বসিয়ে দিলো এক লাথি! মতি ভাই দশ হাত দূরে ছিটকে পড়লেন। পড়লেন তো পড়লেই নি তাও আবার গরুর গোবরের স্তুপের উপর!
মতি ভাই চেচাতে লাগলেন।  আশেপাশে মানুষ হাসলে লাগল। মতি ভাইয়ের সারা শরীর এবং জানাতে গোবর লেগে আছে। কিন্তু তিনি হেরে যাওয়ার মানুষ না। গরু নাকি সেল্ফি তুলতে চায় না? এটা কোন কথা! গরুর সংগে সেল্ফি তুলে ফেসবুকে দিতেই হবে! সেল্ফি তোলার আগে তিনি গোবরের স্তুপ থেকে উঠে গরুর একটা সিংগেল ছবি তুলেই ফেসবুকে দিয়ে দিলেন, ক্যাপশন দিলেন, আমার গরু.... গরুটা কেমন লাগছে? নিচে একজন কমেন্ট করল, 'ভাই আপনাকে তো সুন্দর লাগছে কিন্তু গরু কই ভাই?' মতি ভাই তার কমেন্ট দেখে রেগেমেগে ব্লক দিয়ে দিলেন। 

গরুর গলায় সিং এর মালা পড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সংগে সংগে ছেলেগুলো শ্লোগান দিয়ে যাচ্ছে। মতি চাওয়ের মুখে অন্যরকম এক সাফল্যের হাসি লেগে আছে। এই মহল্লায় তার চেয়ে বেশি দাম দিয়ে গরু কেনেনি। ভাবতেই ভালো লাগছে। ভালো লাগাটা যদিও বেশিক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হয় না মতি ভাইয়ের চোখে মুখে। দামি গরু কিনলে ঠেলাগুলোও বড়সড় খেতে হয়, দামী গরুর ঢং তো বেশি থাকবেই, নাকি! কিছু দূর যাওয়ার পর গরু দিলো ভো দোড়! শুরু হলো গরুর পিছনে ম্যারাথন ।
সামনে দৌড়াচ্ছে গরু। তার পিছনে পোলাপান।  সবার পিছনে মতি ভাই। পোলাপান দৌড়াচ্ছে তাও আবার স্লোগান দিতে দিতে। মতি ভাইয়ের বিরক্ত আরো বেড়ে গেলো! 
দৌড়াতে দৌড়াতে মতি ভাই বেশ হাপিয়ে উঠেছেন মতি ভাই। মহল্লার অলিগলি দৌড়ানোর পর শেষমেশ পোলাপানগুলো গরুকে ধরতে পারল। গরু নিয়ে রি যাত্রায় কোনমতে বাসায় আসলেন মতি ভাই। 
বাসার সামনে প্রদর্শনীর জন্য গরুকে রাখা হয়েছে। মহল্লার সবচেয়ে বড় এবং দামী গরু এটি। বিভিন্ন বয়সী ছেলেমেয়েরা এসে গরুর সংগে সেল্ফি তুলছে। মতি ভাই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন,
-সেল্ফি তোলো ভালো কথা। কিন্তু ফেসবুক পোস্টে কিছু নিয়ম অনুসারণ করতে হবে....
-কী নিয়ম?
- গরুর ভালো ছবি দিতে হবে। এরপর অবশ্যই লিখে দিতে হবে এটা মতি ভাইয়ের গরু এবং সবচেয়ে দামী গরু।
-ঠিক আছে।
আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তে লাগল। মতি ভাই বুনো হাসি দিয়ে মনে মনে ভাবেন "এইবার দেখাইয়া দিলাম"

ঈদের দিন চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল মতি ভাইয়ের। মতি ভাইয়ের গরু খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। একি শুনছে মতি ভাই! তার দুনিয়া পুরো এলোমেলো হয়ে গেল! একটু পর কোরবানি দিতে হবে, অথচ গরু খুজে পাওয়া যাচ্ছে না! চারদিকে হইচই রব পরে গেল! মতি ভাই পুলিশে খবর দিলেন। অনেক খোজার পরও গরু পাওয়া গেলো না। পুলিশ তদন্ত করে জানল, গত রাতেই সম্ভবত গরুটি চুরি হয়ে গেছে। মতি ভাই গরু না পেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। তার মাথায় পানি দিচ্ছেন তার স্ত্রী।  লোকজন আস্তে আস্তে জেনে গেছে মতি ভাইয়ের গরু চুরি হয়ে গেছে। কদিন আগে যারা গরুর সংগে সেল্ফি তুলছে তারাই অজ্ঞান মতি ভাইয়ের সাথে সেল্ফি তুলে ফেসবুকে শিরোনাম দিচ্ছে " লাখ টাকার গরু হারিয়ে মতি ভাই আজ অজ্ঞান" 

Saturday, 26 August 2017

একজন সুখী মানুষের গল্প



আবুল বাশার সাহেব মহাবিরক্ত হয়ে আছে। এমনিতেই রাজপথে হাটুপানি, তার ওপর আজ অফিসে সাধের ছাতাটা রেখে বেরিয়ে পড়েছেন। যা ওয়েদার, খানিক আগে এক ফসলা বৃষ্টি হয়ে চারপাশে তাকিয়ে স্পষ্ট বলে যেওয়া যায়, আকাশে ঘন কালো মেঘ স্থির হয়ে আছে, হয়তো আচমকা বৃষ্টি হয়ে পড়ার মোক্ষম সুযোগ খুজছে। সারাদেশে নিন্ম অঞ্চলগুলোতে ভয়াবহ বন্যার চিত্র কল্পনা করে আবুল বাশার সাহেব নিজেকে সান্ত্বনার অভয় শুনান। হাটুপানি বেয়ে বীরদর্পে বাসা পানে হাটতে থাকেন। বাগড়া দেয় বৃষ্টি, প্রথমে ঝিরঝির এরপর মুষলধারা বৃষ্টির ফোটা পড়ে জামা-কাপড়, অফিস ব্যাগ ভিজিয়ে দেয়।

'জঘন্য ওয়েদার' ফাজিল বৃষ্টি'!  বিড়বিড় করে বলেন বাশার সাহেব। কিছু সময়ে তিনি রবীন্দ্রনার্থ কিংবা হুমায়ূন আহমেদের বৃষ্টি বিষয়ক রোমান্টিক কবিতা-গান বেমালুম ভুলে যায়।

মগবাজারের পচতলার বাড়ীটার ৫ তলার একটি ফ্লাটে আবুল বাশার সাহেবের বসবাস।  বাসার সামনের রাস্তাটায় হাটুপানি জমে আছে বহুদিন। কারন এতদিন ধরেই পানি জমে আছে যে বাশার সাহেবের সাধ্য নেই গণনা করে সঠিক সংখ্যাটা বের করবেন। এই নগরী দুইজন মেয়রের অস্তিত্ব সংকট ভুগছে অথচ মেয়রদ্বয়ের মতো হাজারখানেক দর্শক পেলেও এ শিল্প ঘুরে দাড়াতে পারে। আফসোস।

এসব হাজারটা সমস্যার মধ্যে কিছু পোলাপান আবার বন্যার্তদের জন্য ত্রান চাইতে আসে। বাশার সাহেব ঠিক করলেন,  কাউকে কিছু দেবেন না! বন্যার্ত আবার কি, শহর বন্দর সবখানেই তো বন্যা!
হঠাত সেদিন সন্ধ্যায়, পাঁচতলা ভবন প্রবলভাবে দুলে উঠলো। সাধারণ ভূমিকম্পে যতটুকু দোলে তার ছেয়েও ভয়াবহ এর দুলুনি। আবুল বাশার সাহেব একদিকে কাত হয়ে কোনরকম নিজেকে ব্যালেন্স রাখলেন। দুলুনি কমে এসেছে, তবে গলা শুখিয়ে গেছে প্রচণ্ড! একগ্লাস পানি খেতে পারলে মন্দ হতো না.... তার স্ত্রী ছেলেসহ বাপের বাড়ি গেছে, পানি দেওয়ার কেউ নেই। আবুল বাশার আরো কিছু ভাবতে যাচ্ছিলেন, তবে তিনি স্পষ্ট অনুভব করলেন পুরো ভবন দ্রুতবেগে চলতে শুরু করেছে। মহাসড়কে এসি বাসের মত তুমুল সেই বেগ। আবুল সাহেব চেহারায় প্রচণ্ড বিরক্তি ফুটিয়ে তুলে বললেন, 'এসব হচ্ছেটা কী? ফাজলামো নাকি?

তবে হুট করে তার মনে হলো ব্যাপারটা খারাপ না। বিল্ডিংটা হয়তো নিজে নিজেই হেটে বা দৌড়ে অন্য কোথাও চলে যাচ্ছে। তিনি ভাবলেন, ' নাহ, এইবার প্রভু আমার দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন..
জলাবদ্ধ এলাকা থেকে উদ্ধার করে শুলশান, বনানী, মতো অভিজাত এলাকায় ট্রান্সফার করেছেন'। কিন্তু তা কি করে আর সম্ভব!

যাই হোক, আবুল বাশার সাহেব নিজেকে আবিষ্কার করলেন সমুদ্রে। চারদিকে অথৈ পানি। পুরোবাসাসহ তাকে অদৃশ্য কোন শক্তি সমুদ্রে এনে রেখে গেছে। এইবার তিনি ভাবলেন চিতকার করবেন পরক্ষণেই কিছু ভেবে নিরব হয়ে গেলেন। অদ্ভুত ভাবে লক্ষ করলেন তিনি বেশ স্বাচ্ছন্দে পানির নিচে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছেন, সাতার কাটতে পারছেন, মাছের ভাষাও বুঝতে পারছেন। বিরাট শক্তির কথা! যাক বাবা! বউয়ের প্যারা, বৃষ্টির প্যারা এমনকি লাগাতার চলতে থাকা জলাবদ্ধতার প্যারা থেকে তিনি এখন মুক্ত। স্বাচ্ছন্দ্য সাগর চষে বেড়ানো যাবে। সাগরের তাজা তিমির সংগে বড়সড় রকমের ভাব করবেন বলেও ঠিক করে ফেলেন তিনি।

সাগরের দিন-রাত ভালোই কাটছে আবুল বাশার সাহেবের। কেউ কিচ্ছু বলার নেই, কোন অশান্তি কিংবা চিন্তা নেই। কিন্তু হঠাত একদিন......
বাশার সাহেব খেয়াল করলেন, তার পুরোশরীরে জল পেছিয়ে যাচ্ছে! এসব কি! আর কেনই বা অনিচ্ছায় তিনি উপরের দিকে উঠে যাচ্ছেন? পাশ দিয়ে দুটো পাবদা মাছ যাচ্ছিলো, মাছেদের ভাষা বোঝেন বাশার সাহেব, একটা আরেকটাকে টিটকারি মেরে শুনাচ্ছে,
এহ, আইছে মানুষের বাচ্চা সাগরে বাসা বাধতে, এখন জেলের জালে ধরা পইড়া জীবন খোয়াইবো'। তাহলে কি বাশার সাহেব ক্রমেই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন? সাগরে নতুন মাছ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে জেলেদের স্বীকারে পরিণত হতে যাচ্ছেন?

না আ আ আ আওয়াজ ধপ করে বিছানার শোয়া থেকে বসে পড়লেন বাশার সাহেব। ইদানীং তিনি ভয়াবহ সব দু:স্বপ্ন দেখছেন। যাক বাবা, তিনি সমুদ্রে টমুদ্রে না, ছোটখাটো জলাবদ্ধতার ওপরে বেশ আয়েশি বিছানায় শুয়ে আছেন। কিছু সময়ের জন্য তিনি নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ মনে হল। নগরে ফুটপাতে থাকা লোকগুলো কিংবা বানভাসি নিম্নাঞ্চল লোকগুলো ঘুমানোর জন্য সাধারণ বিছানাও তো পাচ্ছে না। সুখের সংঙ্গা সীমিত করে মৃদু হেসে আর একগ্লাস ফ্রিজের ঠান্ডা পানি খেয়ে আবার ঘুমাতে যান আবুল বাশার সাহেব। এরপর থেকে নিজেকে বড় সুখি ভাবতে পারছেন।

Wednesday, 23 August 2017

হিমুর হাতে চিকুনগুনিয়ার ওষুধ


গত কয়েকদিন ধরে বাদলের জ্বর ও শরীর ব্যথা। মাজেদা খালা এই জ্বরের নাম দিয়েছে খই ফোটা জ্বর, মানে জ্বর আক্রান্ত ব্যক্তির কপালে ধান রেখে দিলে সেটা ফুটে খই হয়ে যাবে।
বাদল সেই সন্ধ্যা থেকে হিমু ভাই হিমু ভাই করে অস্থির। এদিকে হিমুকে ফোন দিয়ে কোন ক্রমেই পাওয়া যাচ্ছে না। মাজেদা খালা ফোন করতে করতে মোবাইলের চার্জ শেষ করে ফেলেছেন, কিছুক্ষণ চিতকার চেঁচামেচি পর পাওয়ার ব্যাংক লাগিয়ে শেষ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
আরে গাধা, তুই যে দেশেই যাস, সেখানে গিয়ে হিমুগিরি করিস, ফোনটা তো একবার রোমিং করে হলেও সংঙ্গে নিয়ে যাবি বললে বলতে রাগে গজ গজ করতে করতে হিমুর পুরনো নম্বরে একটা ফোন দিলেন তিনি। মাজেদা খালার স্বভাব হলো,  তিনি ফোন দিলে একবার দেন না। তবে ফোন দেওয়া মানেই, টোটাল তিন বার ফোন দিবেন। বেশিও না কমও না। দানে দানে তিনবার।
পুরনো নম্বরে করা তৃতীয় এবং শেষ ফোনটা রিসিভ হলো।
-হ্যালো কে?
-কে মানে? আমারে চিনিস না তুই?
-দু:খিত জনাবা, আপনি ভুল নম্বরে চেষ্টা করেছেন........
-দ্যাখ হিমু আমার সংঙ্গে নাটক করতে আসবি না। আমি তোর শালাও না দুলাভাই ও না যে আমার সংঙ্গে মশকরা ফলাবি! তোর মত হাজার হাজার অভিনেতা আমার ভ্যানিটিব্যাগে নিয়া ঘুরি। তুই দশ মিনিটের মধ্যে বাসায় আয়। বাদলের সম্ভবত চিকুনগুনিয়া হয়েছে। তোর নম্বর বন্ধ কেন?
-খালা! একটা ভয়ানক কান্ড ঘটে গেছে। আজ দেখলাম আমার বন্ধ সিমে ২০ জিবি ইন্টারনেট এবং ৩০০ মিনিট ফ্রি এসেছে। তাই বাধ্য হয়ে সিম পাল্টাইতে হয়েছে।
হিমু কথাটা শেষ করতে পারলো না ওপাশ থেকে, পুত পুত করে লাইনটা কেটে গেলো।
হিমু এখন মোটেও চিকুনগুনিয়া নিয়ে চিন্তিত না। তার মাথায় এখন গেমস আব থ্রোনস এর নতুন সিজন ঘুরছে। খালার বাসায় ফ্রি ওয়াইফাই, ইচ্ছে মত ডাউনলোড দেওয়া যাবে। মহাপুরুষদের নিশা ধরার কিংবা মোহ পড়ার নিয়ম নাই।
কিন্তু এই গেমস অব থ্রোনসের ব্যাপারটা মাথায় ঢুকে গেছে। হিমু যে অবশ্যই ঠিক দেখার জন্য দেখে, তা নয়। এই জিনিষ অন্যদের আগে দেখে তাদের স্পয়লার দিতে হিমুর ভালো লাগে। সবচেয়ে বেশি আনন্দ, রূপাকে স্পয়লার দিতে।
সুন্দরি নারীদের বিরক্ত হলে খুব সুন্দর দেখায়। ফোনে না দেখতে পেলেও হিমুর রূপার সেই রাগি রাগি বিরক্ত চেহারাটা কল্পনা করতে ভালো লাগে।
সমস্যা একটাই আছে, পাচ ফিট আট ইঞ্চি লম্বা সমস্যা।
খালু সাহেব প্রতিদিন ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করে যাতে হিমু বাসায় এসে কিছু ডাউনলোড দিতে না পারে। তবে অবশ্য বেশি মাতাল হলে পাসওয়ার্ড বলে দেয়।

-এই হিমু এই! কোথায় চললেন?
হিমু পিছনে তাকিয়ে দেখে,  এই ভর দুপুরে রাস্তায় মিসির আলী।
-আর বলবেন না... ঝামেলা হয়ে গেছে। বাদলের তো মহাবিপদ, চিকুনগুনিয়াতে আক্রান্ত। ফু বাবার কাছে ফু আনতে যাচ্ছি।
মিসির আলী অসম্ভব যুক্তিবাদী এবং তীক্ষ বুদ্ধি সম্পন্ন। হিমুকে ভালো কথা বলে ওষুধ কেনানো যাবে বলে তার মনে হয় না। তিনি অন্য কৌশল খাটালেন-
-আপনি বরং এক কাজ করুন, ফু আনাচ্ছেন ভালো, সংঙ্গে কিছু চিকুনগুনিয়ার ওষুধ নিয়ে যান। যদি ফু রাস্তার কোথাও বাতাসে উড়ে যায়! তাহলে অন্তত কিছু তো নিয়ে যাওয়া হল! তাই না?
-হ্যা, এটা ভালো বলেছেন। ফু এর ধর্মই কিন্তু উড়ে যাওয়া। আচ্ছা" ওষুধ কোথায় পাওয়া যাবে?
-রাস্তার মোরে ফার্মেসিতে আছে। দাড়ান ওষুধের নামটা বলি..
-আচ্ছা আমি নিজেই জিজ্ঞেস করে নিবো, চলি মিসির সাহেব।
মিসির আলীর ধারনা, হিমু তারপরও চিকুনগুনিয়ার ওষুধ কিনবে না। সে দোকানে গিয়ে অন্য এক ওষুধের নাম বলবে। তবে তিনি বাধা দিলেন না। তার কেন যেন মনে হচ্ছে সেই ওষুধ খেয়ে বাদলের চিকুনগুনিয়া দুই দিনের মধ্যেই সেরে যাবে। ওষুধের কারনে ছাড়বে না, ছাড়বে বিশ্বাসের কারনে। বিশ্বাস অন্যরকম এক ওষুধ।
হিমু মোড়ের ফার্মেসী কাছাকাছি পৌচে গেছে। এখান থেকে সে রিক্সা নিবে। মাজেদা খালার বাসায় দ্রুত যাওয়া দরকার। বাদলকে সুস্থ করতে নয়, গেমস অব থ্রোনস ডাউনলোড করে দেখে পেলবে। রূপা দেখাত আগেই তাকে স্পয়লার দিতে হবে। এটা খুব জরুরি ব্যাপার।
হিমু রিক্সা নেওয়ার আগে একবার ফার্মেসি উকি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, সি-ভিট আছে?

Monday, 21 August 2017

অত:পর তুই


বাহিরে তুমুল বৃষ্টি। সেই সকাল থেকে আকাশটা কাঁদছে। আর তখন থেকেই আমার মনটা উদাসী মেঘের নিবিড় বন্ধু। শুয়ে শুয়ে সবার কথা ভাবছিলাম। হঠাত তোর ভাবনাতে এসে পোস্তাদানা মনটা ব্রেক করলো আচমকাই। কি জানি কি মনে হলো তোকে লিখতে বসে গেলাম। মনের অনুরোধে কয়েকটা ঘন্টার জন্য চলে আসলাম এফবিতে। অনেক দিন লিখিনা তোকে নিয়ে। তোর মত এমন রোমান্স পাগল বন্ধুর জন্য সময়গুলো যে শুন্যতা মনে হয় না তাও কিন্তু না। খুব ইচ্ছে করে আগের মত চুটিয়ে আড্ডা দেই তোর সংঙ্গে তোদের সংঙ্গে। কিন্তু কেন যেন সব আগোছালো ইদানীং। আমার কি মনে হয় জানিস, একটা সম্পর্ক যতটা গভীরে যাওয়ার চেষ্টা,  অগভীরতা সেখানেই তত বেশি প্রকট।  শুন্য দিয়ে যার শুরু, শুন্য দিয়েই তার শেষ।
কবিতা লিখছি হুলস্থুল, কোন দিন তো নিজ থেকে জানতে চাইলি না কী লিখছি। কিংবা লেখা পড়ে পচা বা ভালো বলার ইচ্ছাও হলো না তোর। শব্দ চয়নে বেশ সাহস দেখাচ্ছি। আমার মত চিন্তা ভাবনার আটপোরে বাংঙ্গালি ছেলের পক্ষে  "কলিজা" (কলিজা বলে ডাকা) শব্দটা সাহসের বৈকি। হাসছিস না কেন? এই লাইন পড়ে তো তোর হাসির কথা!
কিছুদিন ধরে অনলাইনে খুব লিখেছি বিশেষত তোর কিছু ভাবনাগুলো মিলিয়ে নিলাম আমার চেনা তোর সংঙ্গে। খুব যে মিললো তাও না,আবার অমিলটাও নগণ্য।তোর তীরটা এবার ছেলেদের দিকে ছোড়! একটা মেয়ের একটা ছেলেকে বেশি দিন ভালো লাগে না। সে ক্ষেত্রে নারী হিসেবে আদৌ কোন দিকটা তোর ভালো লাগবে! এখন তোকে একটা প্রশ্ন করি, সব কিছু জেনেও অর্থাৎ ছেলেটার সবরকম দুর্বলতা জানার পরও সে যদি তোকে ভালোবাসতে চায়, তোর সংঙ্গে চলতে চায় তাহলে কি তুই তার হাতে হাত রাখবি? ধাধাময় একটা প্রশ্ন মনে হচ্ছে তাই না? তবে সাধারণ বাংঙ্গালি নারীগুলো নিজেকে যতই ভালো স্বীকার করুক না কেন, স্বামী চাই স্মাট ছেলে,  বৃত্তবান এবং তাদের মনটা লোকাল বাসের মত পরিবর্তনীয়। এবং এটাই বড় কৌতুক।

বন্ধু, পূর্ণিমায় সমুদ্র দেখেছিস কখনও? কিংবা বৃষ্টি ঝড়তে দেখেছিস? হুমায়ূন আহম্মেদের দারুচিনি দ্বীপ পড়ে কি যে ইচ্ছে হয়েছিলো আমার দুর্দান্ত এক ফ্রেন্ড সার্কেল থাকবে। তোকে নিয়ে অনলাইনগুলোতে সবার সাথে আড্ডা দিবো দিনে রাতে সারাক্ষণ। তারপর তোকে নিয়ে চষে বেড়াব পুরো বাংলাদেশ। মহেঞ্জোদারো, সেন্টমার্টিন, চা বাগান, নেত্রকোনা বিরিশিরি। শুধু তাই নয় তোকে নিয়ে আরো ঘুরবো ভারতের কাশ্মীর দার্জিলিং মত এবং নেপালের এভারেস্টে। সব হাতের মুঠও বন্ধু তোর সান্নিধ্য,  অথচ আর হলো কই! কেউ কি নেই আমার কষ্টে পাশে এসে দাড়ানোর? হাতটা ধরে আশ্বস্ত ভংঙ্গিতে বলা, 'আমি তো পাশেই আছি" (জানি তুই বলবিনা তবুও আশায় থাকি)। আমার কালো চাদিয়ালটা বৈশাখী বাতাসে ঝরা পাতার মত বেখেয়ালি হুটোপুটির পর মুখ তুবড়ে পড়ে থাকে হৃদয়হীন কারো কাছে। অথচ এই আমি আবার চাই উড়ুক ঘুড়ি। আবারও আমি আমার ক্ষয়িণ্ষু হৃদপন্ডিটা ঝেড়েঝুড়ে কালিঝুলি পরিষ্কার করে চকচকে করে তুলি। কোন এক রোদমরা বিকেলে সবুজ ঘাসে পা ডুবিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চেনা নাটাই হাতে তৃপ্তির হাসি হাসব বলে। কিন্তু আরো কষ্ট হয় প্রিয় স্বপ্ন, প্রিয় গহিন চাওয়া। শক্তি থাকেনা উঠে দাড়াবার। আরো একবার মুখ তুলে আকাশখানা দেখবার। বিকেল গড়ায় সন্ধ্যা নামে, রাত বাড়ে, প্রহর শেষে শিয়াল ডাকার আওয়াজ শুনি, ঝিঝি পোকার বুনো ডাক মনে হয় রবিশংকরের সেতার  ড্রামবিটের শব্দ শুনি, হৃদপিন্ডের হাপর টানার শব্দ। এক পশলা বৃষ্টি ওই মেঘহীন আকাশ। শুকতারা হাতের করতলে ঠিক চাঁদকপালি হয়ে মিটিমিটি জ্বলছে আর নিভছে। আমি মোহময় মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে আছি। একে একে তারাগুলো অচেনা হয় দিনের আলোর গহিন ফাদে। উঠি উঠি করে সুর্যি মামা উকি দেয় চোখের জানালার কর্নিশ ধরে। কেপে উঠে চোখের পাতা। শিশির টুপ করে ঝড়ে পড়ে ঠোটের উপর। ধড়ফড় করে জেগে উঠি। আকুলতা নিয়ে তাকাই দূর গহিনে সরু হয়ে যাওয়া ঘাসহীন পথটার দিকে। এক মোহনীয় অর্গানের স্বপ্ন ভাংগানিয়া সুর আমার সব দু:খ ভুলিয়ে দেয়।
মানুষের ভেতর আর শেকড় গেড়ে বসতে ইচ্ছে করে নারে। কারন সে হারাবেই। মাঝে মাঝে দেখা হলে বেশ হয়। সেটাও হয়ে উঠে না। হুট করে হড়বড় করে বলে ফেলা যাবে অনেক কথাই। চিঠি লিখবি? বলবি আমি তোমার পাশে আছি এবং থাকবো? এটা অনুরোধ নয়, আবদার। ললিপপ চাইবার মত আবদার। রাখবি? জানি তুই ভালো থাকবি। সব কিছু নতুন করে গড়বি। কিন্তু আমি যে তো অপেক্ষায় স্বর্গের খুব কাছাকাছি তা জানিস? সব কিছু তোর কাছে মনে হয় অবিশ্বাস, যেদিন স্বর্গময় হবো সেদিন বুঝবি বিশ্বাস। ভালো থাকিস।
তোর জন্য কবিতার লাইনটুকু।

         জীবনসংঙ্গি হতে চেয়ে তোমার
                বাড়িয়ে ছিলাম হাত,
            ফিরিয়ে দিয়ে শত্রু বানিয়ে
                   করলে আকস্মাৎ।
           কি ছিলো দোষ আমার তাতে
                    কিংবা অভিমান,
            বুকের মাঝে বাজছে আজো
                      কষ্টে ভরা গান।
            ফিরিয়ে দিলেও বন্ধু আজও
                   হাত বাড়িয়ে আছি,
              নাইবা হলাম বন্ধু তোমার
                     শত্রু হয়েই বাচি।

Sunday, 20 August 2017

ফ্লাইওভারের প্রেম


ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে উড়াল দিচ্ছিলাম। হ্যা, উড়াল দিচ্ছিলাম। ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে সাধারণ মানুষ হাটে না। নিচ দিয়ে হাটে। উপর দিয়ে গাড়ি চলে। কিন্তু উপর দিয়েই হাটি। হাটি না ঠিক, উড়াল দেই। দ্বিতীয় কারন আমি আধুনিকতা পছন্দ করি। মন্দ জিনিসের ভালো দিকটা খুজে বের করি। ইদানীং ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে না হাটাই ভালো। গাড়ি নিয়ে যেতেও মানুষ ভয় পায়। যেখানে ফ্লাইওভার ভেংগে পড়ছে তাতে নিচ দিয়ে হেটে যাওয়া দু:সাহস দেখানোই বলা চলে। কিন্তু আমি চালাক মানুষ। অনেক ভেবেচিন্তে দেখলাম ভাংলেতো নিচে ভেংগে পড়বো। উপরে না। তাই আমি উপর দিয়ে হাটি। উপরে জ্যামও তুলনামূলক কম। অনেক জায়গা নিয়ে হেলেদুলে হাটা যায়।
এভাবে কয়েকদিন যাতায়াতে আমার নাগরিক জীবনে বেশ স্বস্তি ছিলো। কিছু দিন না যেতেই দেখা দিন অস্বস্তির। নাগরিক জীবনে নাগরিকতাময় দেখা পেলাম। ফ্লাইওভার গা ঘেঁষে এক সুউচ্চ বিল্ডিংয়ের বারান্দায় প্রতিদিন সকাল ১০ টায় এক সুন্দরি চুল শুকাতে আসে। রোদ উঠার সংগে সংগে আমি সে প্রকৃতির স সৌন্দর্য উপভোগ করি। রোজ আমাদের দেখা হয়, চোখাচোখি হয়, আড়ালে হাসাহাসি হয়। আহ! নাগরিক ফ্লাইওভারের জীবন। বেশ ভালোই কাটছিলো।
এভাবে দুএক মাস যাওয়ার পর একদিন চিন্তা করলাম চোখাচোখি ধাপ অনেক ধীর্ঘ হল। আর কত! ভাবলাম সুন্দরির সংগে কথা বলবো। অন্তত নামটা জিজ্ঞেস করবো। বারান্দার গ্রিলেত কাছে গিয়ে বলবো, এই যে শুনছেন?
প্রতিদিনের মত সেদিনও এই ভাসনা নিয়ে ফ্লাইওভার দিয়ে হাটছিলাম। এক সময় কাংখিত বিল্ডিং এর বারান্দার পাশে গিয়ে দাড়ালাম। দাঁড়িয়ে আছি, তো আছি! আছি তো আছিই! দেড়টা ঘন্টা গেলো কেউ কথা রাখলো না! বেদের মেয়ে জোছনাও তো ফাঁকি দিয়ে শেষমেশ এসেছিল, অথচ ফ্লাই ওভাবেরসুন্দরি আর এলো না।
উকি দিয়ে বুঝলাম, আসেনি, আর বুঝি আসবেও না। ব্যাকগ্রাউন্ডে বাংলা সিনেমার 'অ অ আ আ আ' বেজে উঠলো!  দেখলাম ওদের বাসায় সব ফাকা। কোন ফার্ণিচার নেই, কিচ্ছু নেই! এ কি হলো। নিজেকে প্রেমিক নয়, মনে হয় এক বাপ্পারাজ!
মন খারাপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। পিছন থেকে লোকজনের চিতকার, এই ভাই সাইড দেন। এভাবে দাঁড়ায় থাকলে আমরা হাটুম কেমনে? আপনের বাপের ফ্লাইওভার?
কাটা গায়ে নুনের ছিটকাক মত মনে হল। শালার ভাঙালি, তোদের জন্য ফ্লাইওভারের নিচেও সুখ নাই, উপরেও সুখ নাই। নিচ থেকে উড়াল দিয়ে উপরে আসলাম। যে একটা প্রেম হতে যাবে, তাও আবার উড়াল দিলো! ফ্লাইওভার ভাংঙ্গে  নি তাতে কি, মন তো ভেঙেছে! মন ভাংঙা যদি মসজিদ ভাংগা সমান হয়, ফ্লাইওভার ভাংঙার চেয়ে তো বেশি কিছু বটেই!


যে কারনে অামি সিঙ্গেল


বিশ্ববিদ্যালয় মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার পরও যদি কারো প্রেম না হয়, তখন সেটা মোটামুটি একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অন্তত আমার বন্ধুমহল তাই বিশ্বাস করে।
এরকম হেন অপরাধের শাস্তিসরূপ প্রায়ই 'মেনশন করুন আপনার সেই বন্ধুটিকে যার বিশ্ববিদ্যালয় উঠেও এখনো প্রেম হয় নি' মূলত ফেসবুক পোস্টে টেগ খেতে হয়। আমি নিতান্তই বিরক্ত হই না, এটা বলা বড্ড বেশি বিনয় হয়ে যাবে বটে।
তবে এক বন্ধু অন্য বন্ধুকে খোঁচাবে এটাই স্বাভাবিক - সেই স্বাভাবিকতার সুত্র মেনে নিয়ে ওদের ফাকা মাঠে গোল দিতে দেই।
অন্যান্য দিনের মত আজও আড্ডা সেরে বাসায় ফিরলাম। মাথার ওপর কটকটে সূর্যের একত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করতে না পেরে ঠিক করলাম আইসক্রিম খাবো। ক দিন আগের বৃষ্টি কোথায় গুম হয়েছে কে বলবে। ডাইনোসরের ফসিল খুজে পাওয়া যেতে পারে, তবে গুম কিছু এখানে খুজে পাওয়া দুষ্কর।  যে ভাবা সেই কাজ! বাসার নিচের ছোট দোকান থেকে আইসক্রিম কিনলাম। চারতালা উঠতে উঠতে পুরোটা শেষ হয়ে যাবে এই ভেবে আইসক্রিমের প্যাকেট ছিড়লাম। এরকম অসহ্য গরমের দিনে একটা আইসক্রিম পাওয়ার আকুলতা থেকে কবি ব্রুনো মার্স গেয়েছেন 'আই উইল ক্যাচ আ গ্রেনেড ফর ইয়া....'। আমি আরাম করে আইসক্রিম খেতে খেতে সিঁড়ি বেয়ে উঠছি। মনের সুখে গান গাইতে লাগলাম, আমার এক হাতে নুপুর, থুক্কু, আইসক্রিম আর অন্য হাতে আইক্রিমের প্যাকেট।
দোতলা উঠে গেছি। এমন সময় কে জেন খুব তাড়াহুড়া করে নামতে গিয়ে ধাক্কা দিল। বাংলা সিনেমায় নাটকের এমন দৃশ্যে বোকা টাইপ চশমা পরা নায়কের চোখের চশমা পড়ে যাওয়া, তারপর  নায়ক নাইকা চশমা তুলতে গিয়ে মাথায় ঠোকাঠুকি।

আমার হাতে আইসক্রিম ছিলো। ধাক্কা খেয়ে সেটা ছিটকে পড়ে গেলো। যে ধাক্কা দিয়েছে সে আমার চেয়ে সিড়ির কয়েক ধাপ নিচে দাঁড়ানো অবস্থায় থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। আমি আইসক্রিম হারানো বেদনা নিয়ে সেটা কুড়াতে গেলাম। একটা আধখাওয়া আইসক্রিম ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হবে ভেবেই দু:খের সঙ্গে আরও বেশি গরম লাগছিল।

'সরি, সরি! আপনি প্লিজ ওই আইসক্রিমটা আর খাবেন না। আপনাকে আমি আরেকটা আইসক্রিম কিনে দেই, চলুন!' এক নি:শ্বাসে বেশ ভারি কন্ঠে কথাগুলো বললো কেউ।
আইক্রিমের শোকে ধাক্কা খেয়ে থতমত ভঙ্গিতে দণ্ডায়মান ব্যক্তির কথা এতক্ষণ মাথায় ছিলো না। আমি আইসক্রিম তুলতে তুলতে বিরক্ত কন্ঠে বললাম, 'আইসক্রিম ডাস্টবিনে ফেলার জন্য তুলছিলাম। ময়লা যেখানে সেখানে ফেলতে নেই'।  কথা শেষ করে ব্যক্তিটির দিকে তাকালাম। মোটামুটি লম্বা, ফর্সা, চশমা পরা একটি সুন্দর মেয়ে। বয়সে আমার চেয়ে দুই তিন বছরের ছোট হবে। তাত দীপ্তিমান চেহারার দিকে তকিয়ে ভাবতে লাগলাম, এত সুন্দর মেয়ে আমাদের বিল্ডিং এ এলো কোথা থেকে?
উত্তর শুনে সে একটু খানি হাসলো। এমন চমতকার হাসির জন্য আইসক্রিম ফেলে দেওয়ার অপরাধ ক্ষমা করা যায়। বাংলা সিনেমার লজিক বলে 'ধাক্কা থেকে প্রেম'। কোন সুন্দরি মেয়ে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট একসেপ্ট করলে যেমন ছেলেদের মনে কে জেন উকি দিয়ে বলে,' আমাদের মনে হয় বিয়ে হবে' আমারও তেমন মনের মধ্যে কে যেন উকি দিয়ে ফিসফিস করে বলে গেলো 'যাক, আজ থেকে আর কোন আজগুবি ফেসবুক পোস্টে ট্যাগ খেতে হবে না!' ভেবে আমিও একটু হাসলাম। আমি বললাম, না না ঠিক আছে। ঠিক আছে। মেয়েটা আবার সরি বলে সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলো। 'সরি' শব্দ শুনেই কলিজাটা ঠান্ড হয়ে জিরো ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পরিণত হলো।

এর কিছুক্ষণ পর আমার হাসিটা গুম হয়ে গেলো। জিরো ডিগ্রি পরির্তন হয়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পরিণত হলো। সাথে সাথে মুখটাও পাতিলের তলার মত কুচকুচে কালা অনুভব করতে লাগলাম। মনের ভিতর মনে হচ্ছে একটা দুইটা নয়, চার পাচটা ডিনামাইট ফেটে গিয়ে রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছে। পুরো দেহটাই কিছুক্ষণের জন্য একটা হিরোশিমা শহরে পরিণত হলো।
মেয়েটির পিছনে পিছনে সিড়ি দিয়ে নেমেই দেখলাম একটি ছেলে বাইক নিয়ে অপেক্ষা করতেছিলো। তারপর যা হবার কথা তাই হলো। বাংলা সিনেমার মত ধোকা খেয়ে বোকার মত দাঁড়িয়ে রইলাম। ঠিক যেন বাংলা সিনেমার প্রেমে ব্যর্থ হওয়া নায়ক বাপ্পারাজ। প্রেমে করার আগেই ছেকা খেয়ে ব্যাকা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। হাতে অবশ্যই পড়ে যাওয়া আইসক্রিম ছিলো। যাই হোক, প্রেম করতে পারলাম না কিন্তু আইসক্রিম তো ডাস্টবিনে ফেলতে পারবো! মনে পড়ে গেলো সেই বিখ্যাত শিয়ালের না পাওয়া আঙুর ফলের কথা। ভাবতে লাগলাম আসলেই শিয়াল মামার কথাটাই এক্কেরে হাচা কথা 'আঙুর ফল টক'।  আইসক্রিম ডাস্টবিনে ফেলতে ফেলতে বলতে লাগলাম, আসলে প্রেমটেম ভালো না, প্রেম মানেই কষ্ট, যেহেতু আমি কষ্টটষ্ট চাইনা সেহেতু প্রেমটেম ও ভালো না। আমি ইউ রিয়েল।


আমি হিমু হতে চাই নি!



কাওরান বাজারের ফুটফাত শরাফত হিমুর মত খালি পায়ে হেটে যাচ্ছে। খানিক দূরে পিচ ঢালা মুল রাস্তায় গেউ গেউ করতে থাকা কুকুরটাও তার দিকে তাকাচ্ছে না। হিমু হতে চায় এমন  অনেকেই দেখেছে সে। কিন্তু হিমু হতে চাওয়ার কোন ব্যাপার তার মধ্যে নেই, নিতান্ত অসহায় হয়েই তাকে খালি পায়ে হেটে যেতে হচ্ছে।

একটু ফ্ল্যাশব্যাক গেলে অবশ্যই তার খালি পায়ের রহস্যটা জানা যায়..

শরাফাত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়েছে তখন। জেলা শহরে তার সুদৃশ্য ছিলো। কলেজে উঠার পর তার বাবার কাছ থেকে জোর করে বাইক আদায় করে নেয়। জগন্নাথে ভর্তি হয়ে একটা ডিএসএলআর হয়ে গেলো। শরাফতের বাবা খুব সচেতন লোক, এ বয়সে ছেলেদের চাহিদা তিনি বুঝেন। তবে ছেলেকে একটাই শর্ত দিলেন, পড়ালেখা করতে হবে ঠিকঠাক। শরাফত মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির হলেও তার বারা হাত খরচ টা একটু বেশিই পাঠান। মিশুক টাইপেট ছেলে বলে যে মেসে উঠেছে সে মেসের প্রায় সবার একান্ত প্রিয় দের তালিকায় চলে যায় শরাফত। তাছাড়া বাইক,  ডিএসএকআর একটা প্রভাব তো থাকেই। ভার্সিটি লাইফে প্রথম প্রেম হয়ে যেতেও সময় লেগেছে মাত্র ২০ দিন। একই ডিপার্টমেন্ট এর সুমাইয়ার সাথে প্রেম হয় তার। তার প্রতি সুমাইয়ার দুর্বলতা আচ করতে পেরে শরাফত প্রথম প্রফোজ করে, এর পর থেকে আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতেই হয় নি। আজ কাওরান বাজারের ফুটফাতেও সে সামনে তাকিতেই হাটছে।
প্রোফজের দিনটার কথা মনে করার চেষ্টা করে শরাফত। মেসের বড় ভাই মজিবরের কাছ থেকে নগদ বিশ হাজার টাকা ধার নিয়ে প্রোফজ করার জন্য বসুন্ধরা থেকে স্পেশাল আংটি কিনেছিলো সে। সুমাইয়ার সেদিনের চকচকে চেহারাটা আজো চোখে ভাসছে শরাফাতের। প্রেমের পর শরাফত ভেবেছিলো জীবনটা মন্দ না। আজ ফুটফাতে হাটার সময়ও সে ভাবছে, জীবনটা আসলেই মন্দ না, অন্তত সুমাইয়ার জীবনটা তো অবশ্যই।
সুমাইয়ার প্রেমে এতটাই বিভর ছিলো শরাফত, যখনই যে কোন আবদার নিয়ে আসতো,  শরাফত তার আবদার মেটানোর যথাসম্ভবের চাইতেও এক ডিগ্রী বেশি চেষ্টা করতো। ভালোবাসার দিবসে সুমাইয়াকে গিফট  দিতে হয়েছিলো প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার এটা সেটা শপিং, খাবার দাবারের সহজ আলাপ না হয় বাদ থাক। সাদের ডিএসএলআর টা তাকে হারাতে হয়েছিলো সেদিনই, কারন ডিএসএলআর জমা নিয়েই এই টাকাটা দার দিয়েছিলো মেসের বড় ভাই। সে টাকা আর শোধ করা গেলো কই!
ভালোবাসার দিবসের পর বৈশাখের কথা স্পষ্ট মনে পড়েছে শরাফাতের। বৈশাখে অবশ্যই বিশ হাজার খরচেই শপিং আটকানো গিয়েছিলো, অল ক্রেডিট গোজ টুটাইম, সেদিন মার্কেট বন্ধ করে দেওয়ার টাইম ঘনিয়ে এসেছিলো বলে এটা সম্ভব হয়েছিলো।
ঈদ উপলক্ষে গার্লফ্রেন্ড গিফট দিতে হবে এটা তার ভালোই জানা ছিলো। শেষ সম্বল ভরসা রাখার একমাত্র জাগয়া বাইকটা বিক্রি করে রমজানের দুইদিন আগে গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে মার্কেটে ছুটলো শরাফাত। শরাফত ভাবে,  প্রেম টিকলে এমন হাজারটা বাইক বিসর্জন তা কাছে কিছুই না। বাইকের টাকাও সুমাইয়ার মন মত শপিং হলো না, নাকফুলটা কিনার তখনও বাকী ছিলো। ঈদের আগেই এটাও হয়ে যাবে বলে শরাফত প্রেমিকাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলো সেদিন। আহা, শরাফত সুমাইয়ার করা ওদিনের মুখটাও মনে করার চেষ্টা করে। শরাফত রমজানটা রিলাক্স হয়ে কাটাবে ভেবেছিলো, গার্লফ্রেন্ড কেই প্রর্যাপ্ত ঈদ উপহার কিনে দেওয়া শেষ। তবে বিপত্তি ঘটলো পরশু দিন। ফুটফাতে হাটতে হাটতে নিজ মনেই হেসে উঠলো শরাফত।  ব্রেকাআপ টা তার কাংখিত ছিলো না মোটেই। সে কল্পনায়ও ভাবেনি সুমাইয়াকে ব্রেকা আপ করো বললে সে নির্দ্ধিধায় সে হ্যা বলে দেবে!
শরাফত পরশু দিনের ঘটনা মনে করতে চাইছে না। সেহেরি খেয়ে কি সুন্দর চ্যাটে 'হ্যাপি ডে' 'সোনা বাবু' বলে ঘুমাতে গেল, ঘুম ভাঙল সেই সুমাইয়ার ফোন কলেই। বাজারে নতুন এসেছে কাটাপ্পা ড্রেস এবং শিবগামি নেকলেস, যা তার লাগবেই। তার বান্ধবিদের সবাই নাকি এই আজগবি গিফট পেয়েছে, এখন তাকেও পেতে হবে। রমজানের আগেই লক্ষাধিক টাকার গিফট দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে কোন কাজ হলো না। মেসের বড় ভাইয়ের কাছে নিজের খাট, পড়ার ডেস্ক আর বই পত্র বন্ধক রেখে বিশ হাজার টাকা নিয়ে তখনি ছুটতে হলো প্রেমিকাকে কাটাপ্পা ড্রেস আর শিবগামী নেকলেস কিনে দিতে।
এতটুকু পর্যন্ত ঠিক ছিলো। তবে পরদিন অর্থাৎ গতকাল আবারও গার্লফ্রেন্ডের ফোনে তার ঘুম ভাঙল এবং নতুন "বিলকিছ জুতা" গিফট এর বায়না পূরণ ছুটতে হলো। যথারীতি এবার বন্ধক মোবাইল ফোন। জুতা কিনে দেওয়ার পর গার্লফ্রেন্ডের হাসি তার মনে স্বস্তি বয়ে আনলো। রিকশায় করে প্রেমিকাকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে যাচ্ছিল শরাফত, হঠাত কি ভেবে সুমাইয়া বলে উঠলো 'এই শুনো, ভুলেই গিয়েছিলাম, আমার জরুরি নেইল পালিশ লাগবে। চলো না আবার মার্কেটে যাই।
টাকার কোন উতস মানে বন্ধক রাখার জন্য কোনো কিছু খুঁজে পেলো না শরাফাত। গার্লফ্রেন্ডকে একটা হাত পাখা কিনে দেওয়ার টাকাও অবশিষ্ট নেই তার হাতে। কীভাবে সুমাইয়াকে দমানো যায় খানিকটা ভাবলো সে। 'সুমাইয়া আমার রাগ টের পেলে দমে যাবে', মনে মনে ভাবে শরাফত।
'দেখো, সুমাইয়া! আমি তোমাকে আর কিছুই কিনে দিতে পারবো না, চাইলে তুমি ব্রেক আপ করে নাও'
একটি কর্কশ শোনায় শরাফতের কন্ঠ।
সুমাইয়া কথাটাকে টেনে নিয়ে আসে, হ্যা ব্রেক আপ, সামান্য একটা নেইল পালিশ চাইলে যে বয়ফ্রেন্ড ব্রেক আপ করে নাও বলতে পারে তার সংগে রিলেশনশিপ আমার কোন আগ্রহ নেই। আমি কি গাড়িবাড়ি এসব কিছু চেয়েছিলাম? আজ থেকে তোমার রাস্তা এই দিকে আমার রাস্তা অন্যদিকে, যাও রাস্তা মাপো' স্বাভাবিক গলায় কথাগুলো বলে যায় সুমাইয়া।  রিক্সা থামিয়ে নামিয়েও দেয় তাকে।
এবার ফুটপাতের পাশে বসে পড়ে শরাফত, আর ভাবতে পারছে না। প্যাকেট থেকে একটা গোল্ডলিফ সিগারেট বের করে সে, সিগারেট টা ধরিয়ে ফিল্টারে ফুক দেয়। আজ নামমাত্র মূল্যে মুচির কাছে জুতা জোড়া না বেচলে সিগারেটের প্যাকেটটা কেনা হতো না তার।
অথচ সে কখনোও অন্য অনেকের মত হিমু হতে চায়নি!!!""""


গরু হারিয়ে মতি ভাই আজ অজ্ঞান

তিল কে তাল করা মতি ভাইয়ের অভ্যাস। কোন কিছু ঘটার আগে তা ফলাও করে প্রচারনা না করলে তার ঘুম আসে না। কোরবানী এসে গেছে।, সবাই ইনবক্সে মতি ভা...